মানুষের জন্য বেঁচে থাকা এক জীবন : কে এম আবু তাহের চৌধুরী


admin প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৫, ৯:৪৭ অপরাহ্ন /
মানুষের জন্য বেঁচে থাকা এক জীবন : কে এম আবু তাহের চৌধুরী
সিলেট বিডি ভিউ: যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট, সুলেখক ও নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিটি নেতা কে এম আবু তাহের চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ‘রঙের দুনিয়া’র প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১৩ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় সিলেটে অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানটি সিলেটের পূর্ব জিন্দাবাজারের কুমারপাড়া কমপ্লেক্সের ফুড প্যারাডাইস রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড পার্টি সেন্টার-এ আয়োজিত হবে। ‘পাণ্ডুলিপি প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থের মাধ্যমে আবারও নতুন আলোচনায় উঠে এলেন তিনি, যিনি প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশি সমাজ ও সংস্কৃতিকে আলোকিত করেছেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন ভাষাসৈনিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মাসউদ খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী, সাহিত্য সমালোচক কর্নেল (অব.) সৈয়দ আলী আহমদ, সাংবাদিক-সাহিত্যিক আফতাব চৌধুরী, শিক্ষাবিদ-অনুবাদক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামস উদ্দিন (আরণ্যক শামস) এবং কেমুসাস সিলেটের সাধারণ সম্পাদক সেলিম আউয়াল। প্রকাশনা উৎসব কমিটি গভীর আন্তরিকতার সাথে সকলের উপস্থিতি কামনা করেছে । কমিটির আহ্বায়ক মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান এবং সদস্য-সচিব বায়েজিদ মাহমুদ ফয়সল জানিয়েছেন, আমন্ত্রিত অতিথিদের সানুগ্রহ উপস্থিতি তাদের প্রাণিত করবে এবং প্রকাশনা অনুষ্ঠানটিকে সর্বাত্মক সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত করে তুলবে।

প্রবাস জীবন কেবল ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের গল্প নয়, বরং তা হয়ে উঠতে পারে সমষ্টির কল্যাণ, অধিকার রক্ষা এবং সংস্কৃতির ধারক-বাহক হওয়ার এক বিরল অধ্যায়। যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও কমিউনিটি নেতা কে এম আবু তাহের চৌধুরীর জীবনকথা সেই অনন্য উদাহরণ। তাঁর কর্ম, ত্যাগ আর সংগ্রাম প্রমাণ করে—একজন মানুষের অদম্য মনোবল কীভাবে গোটা প্রবাসী সমাজকে আলোয় ভরিয়ে দিতে পারে।

১৯৫৬ সালে মৌলভীবাজারের ইটা সিংকাপনী গ্রামের আধ্যাত্মিক খ্যাতিসম্পন্ন মৌলানা পরিবারে জন্ম নেন আবু তাহের চৌধুরী। তাঁর পিতা হাফেজ মাওলানা আব্দুল কাদির চৌধুরী (রহ.) ছিলেন একাধারে আলেম, ওলী এবং শতাধিক গ্রন্থ রচয়িতা। সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা তাহের চৌধুরীর শৈশবেই ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার বীজ বপন হয়। তিনি শ্যামরার বাজার প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে কাশিনাথ আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, মৌলভীবাজার কলেজ এবং সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট—প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।

ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান লন্ডনে। সেখানে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ও কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ বিষয়ে সনদ অর্জন করেন। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরির জগতে থিতু হলেও তাঁর মনের গভীরে গেঁথে ছিলো লেখালেখি ও মানুষের সেবা করার অদম্য ইচ্ছা। ১৯৮৪ সালে প্রিন্স ফিলিপের আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্যে রাউন্ড টেবিল সম্মেলন এ যোগদানের মাধ্যমে তাঁর প্রবাস জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আর সেখান থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও প্রবাসী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নাম।

লন্ডনে বসবাস শুরু করেই তিনি অনুভব করেন, প্রবাসী বাঙালিদের জীবন ছিলো নানা ভোগান্তি ও বঞ্চনায় জর্জরিত। যোগাযোগের অভাব, আইনি জটিলতা, ভাষাগত সমস্যা কিংবা সামাজিক বৈষম্য—সবকিছু মিলিয়ে তখনকার বাংলাদেশি অভিবাসীরা ছিলেন অসহায়। সেই শূন্যতার জায়গা থেকেই আবু তাহের চৌধুরী এগিয়ে আসেন। তিনি প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় ছিলেন সদা-সক্রিয়। লন্ডন-সিলেট বিমানের ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার দাবি, জমি দখল প্রতিরোধ, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির জটিলতা নিরসন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর নেতৃত্ব ছিল দৃশ্যমান।

শুধু তাই নয়, তিনি প্রবাসীদের ভোটাধিকার আন্দোলন, দ্বৈত নাগরিকত্ব আন্দোলন, সিলেট বিভাগ আন্দোলনসহ বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামেও ছিলেন সামনের সারিতে। মনিকা আলীর ব্রিকলেন উপন্যাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিকৃত চিত্রায়ণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন নেতৃত্বদাতা।

পূর্ব লন্ডনের ভ্যালেন্স রোডের তাঁর বাড়িটি প্রবাসীদের নির্ভরতার প্রতীক। সেখানে কেউ গেলে ফর্ম পূরণ, অনুবাদ, হাসপাতাল বা স্কুলে ব্যাখ্যা দেওয়া, এমনকি পারিবারিক সমস্যা সমাধান—সবকিছুই তিনি করে থাকেন  বিনা স্বার্থে। অনেকে পেয়েছেন সাময়িক আশ্রয়ও। আসলে সেই বাড়িটি প্রবাসীদের জন্য খোলা দরজার এক আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে সেবাদানই তাঁর একমাত্র মূলনীতি।

পেশাদার সাংবাদিক হিসেবেও তাহের চৌধুরী রেখেছেন শক্ত অবস্থান। সাপ্তাহিক লন্ডন বাংলা, ইউরো বাংলা ও বাংলা পোস্ট পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল এস, ইকরা বাংলা ও সিলেট টিভিতে উপস্থাপক হিসেবেও কাজ করেছেন। ইউকে বাংলা প্রেসক্লাব এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি ইউকের সভাপতি হিসেবে সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা। তাঁর প্রতিটি লেখা ও বক্তৃতায় প্রতিফলিত হয়েছে প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা, বেদনা, সংগ্রাম ও আশার গল্প। সম্প্রতি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘রঙের দুনিয়া’ সেই দীর্ঘ পথচলারই সৃজনশীল বহিঃপ্রকাশ।

সমাজসেবায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতি এসেছে নানা সম্মাননায়—হুজ হু অ্যাওয়ার্ড, স্টার ইন দ্য কমিউনিটি, সিলেট রত্ন, টাওয়ার হ্যামলেটস সিভিক অ্যাওয়ার্ড এবং ব্রিটিশ কমিউনিটি লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড।

রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। বৃটেনের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল এসপায়ার পার্টি-র চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে নির্বাহী মেয়র ও ২৪ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হন, যা প্রমাণ করে তিনি শুধু সাংবাদিক বা লেখকই নন,  পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বের এক প্রতীক।

ব্যক্তিগত জীবনে তাহের চৌধুরী  স্ত্রী, চার পুত্র ও চার কন্যার জনক। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিবার গোটা প্রবাসী সমাজ। তরুণরা তাঁকে দেখেছেন পথপ্রদর্শক হিসেবে, প্রবীণরা দেখছেন আপনজন হিসেবে। অসুস্থ শরীর নিয়েও তীব্র শীতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রবাসী ভাইবোনদের জন্য ছুটে যাওয়া তাঁর অভ্যাস আজীবনের।

কে এম আবু তাহের চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়—প্রবাস জীবন মানে কেবল ব্যক্তিগত উন্নতি নয়, বরং একটি সমষ্টির জন্য আত্মনিবেদন। তিনি একাধারে সাংবাদিক, লেখক, সমাজসেবক ও আন্দোলনের নেতা। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ প্রমাণ করে, মানুষ যদি চায় তবে সীমান্ত পেরিয়েও হয়ে উঠতে পারে অন্যের আশ্রয়, সাহস ও প্রেরণার প্রতীক। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে প্রবাসীরা বলেন— “তাহের চৌধুরী নিজের প্রয়োজনে নয়, মানুষের প্রয়োজনে বেঁচে আছেন।”

সূত্র: রোকেয়া দিপা, দৈনিক প্রথম আলো